দুর্গা Diaries-১

अहं रुद्रेभिर्वसुभिश्चराम्यहमादित्यैरुत विश्वदेवैः ।
अहं मित्रावरुणोभा बिभर्म्यहमिन्द्राग्नी अहमश्विनोभा ॥ १ ॥
“I move with the Rudras and the Vasus, I walk with the Adityas and all the Gods. I hold up both Mitra and Varuna, I sustain Indra, Agni, and both the Ashvins.” Devi suktam, Rigveda

নামটা হওয়া উচিত ছিল, দুর্গাপুজোর ডায়েরী বা পুজো পরিক্রমা। কিন্তু এখন চটকদার মার্কেটিং এর যুগ,তাই দুর্গা diaries নামটা বেশ যুৎসই লাগলো। কিভাবে লেখাটা শুরু করব ভাবছি, আসলে বয়সের সাথেসাথে মধ্যপ্রদেশ বাড়ছে, আর ওদিকও মাথার ঘিলু প্রপোরশনেটলি কমছে।

লেখাটা সুশি দিয়ে শুরু করি। না না, বাংলার সুশীল সমাজের কথা বলছি না, তারা এমনিতেই আজকাল রং মিলন্তি খেলায় ব্যস্ত, তাদের ব্যতিব্যস্ত করে লাভ নেই। কথা হচ্ছে জাপানিজ sushi নিয়ে। ভাবছেন, ধান ভাঙতে শিবের গীত কেনো? একটু সবুর করে সাবু দানার খিচুড়ি খান তো, এই কয়েকদিন যা রোল সাঁটিয়েছেন,তাতে পেট এ এখন rock and roll হচ্ছে। সুশি থেকে কখন শীলাবতি তে পৌঁছে যাবো টের পাবেন না। শেষ sushi টা শেষ করে অভিক বলল, টোকিও গেলে একটা Bristo র address দেবো, ওখানকার sushi অবশ্যই চেখে দেখিস। আমি বললাম Tokyo দুরস্ত, তারাপীঠ যাওয়ার সময় নেই এই পুজোয়, আমার ভাগ্যে কেবল ই কর্মযোগ। তা তোর এই sushi  কি ক্যাভিয়ার দিয়ে বানায় নাকি; জাপানিজ রাশিয়ান ফিউশন। না না, এরা ২৫ বছর ধরে একদম সাদামাটা সুশি বানায়, কিন্তু প্রত্যেকটা সুশি একই টেস্ট , পুরো ১০০% প্রিসিশন বলতে পারিস। উজবুকের মত জিজ্ঞেস করলাম, লোকজন যায় ওখানে? ৬ month waiting, ৫ star michillen।

মাথার উকুনগুলো নড়ে চড়ে বসলো। সাবেকীয়ানা আর প্রিসিশন কি একই জিনিস? এই যে ইউরোপীয় কৌলীন্য যা দেখতে আপামর বাঙালি হ্যাংলার মত পুজোর ছুটিতে বিদেশ ছুটে যায়, বাঙালি নিজের ক্ষেত্রে তার কতখানি সংরক্ষণ করেছে? বাঙালির কৃষ্টি সংস্কৃতি সাহিত্য সব তো এখন বিজাতীয় ভাষা ও সংস্কৃতির নাগপাশে ধীরে ধীরে কর্পূরের ন্যায় অবলুপ্ত। ( কোথায় একটা লেখা পড়লাম, ভূমি পুজন - বাংলাতে পুজো হয়, পূজন টা কোন শব্দকোষে আছে দেখতে হবে!) দুর্গাপুজো ও তার ব্যতিক্রম নয়, এখন তো দুর্গাপুজোর সাথে নবরাত্রি দণ্ডিয়া ও রাবণ দহনের ত্র্যহস্পর্শ যোগ হয়েছে। বাঙালির পুজো অনেক আগেই তার কৌলীন্য হারিয়েছে, যখন থিম নামক এক অদ্ভুত কিমাকার জন্তু innovation এর নামে বাঙালি জাতি আমদানি করেছে। এখন তো দেখি চারিদিকে থিম পুজোর বাড়বাড়ন্ত, সে বিষবৃক্ষের মতো গ্রাম বাংলাতেও তার জটাজাল বৃদ্ধি করেছে। Intellectuliasim এর থান ইটের ঠোক্কর আমার মাথায় মারলেও, থিম এর tessarect এ আমি হাবু ডুবু খাই।  দোষ অবশ্য আমারি, থিম অনেকাংশে আমার কাছে তামিল মুভি লাগে, দেখতে ভালো, সাবটাইটেল না দিলে বোঝা মুস্কিল। তার ওপর লাইন; ওই ভিড়ে line মারার প্রলোভন দিলেও আমি ওই লাইনে এ দাঁড়াতে রাজি নই। এখন আবার থিমের গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো এসেছে শারদ সম্মান ; বেস্ট মা এর চুল (স্পন্সরড by Loreal shampoo), বেস্ট অসুরের গম্ফ ( by Phillips Trimmer)..best lips এরও কি পুরস্কার আছে?  পুজো এখন থিম ,influencer,insta likes, ভিড় ,মার্কেটিং, ক্যাপিটালিজম ও পুরস্কারের এক অদ্ভুত পাঁচমিশালি কায়মচুর্ণ, যা বাঙালি বছরে একবার করে গলধঃকরণ করে ও তারপর যুকেনবার্গের যৌথ খামারের দেওয়ালে বমন করে।  বনেদি বাড়ির পূজগুলো এই থিমের ভিড় থেকে শত হস্ত দূরে একই প্রতিমা সাবেকি সাজে নিষ্ঠা ভরে একই নিয়ম নীতিতে পুজো করে চলেছে; অনেক খানি ওই জাপানিজ sushi chef এর মত । (কতদিন পারবে জানা নেই, এই Influencer নামক parasiter দৌলতে সেখানেও এখন অবাঞ্ছিত ভিড়!) । আর গ্রাম বাংলার জমিদার বাড়ির পুজো, যেখানে একসময় জমিদারের প্রতাপে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেতো; দুর্ভাগ্যবশত বাঙালি ইতিহাস বিস্মৃত শাসক পদলেহন জাতি, নিজেদের পূর্ব সংস্কৃতি কৃষ্টি সভ্যতা সংরক্ষণ করার কোনো প্রচেষ্টাই সে করে না। তাই সেই রাজাও নাই, পুজো আরম্ভের সেই তোপ ধ্বনিও এখন স্তব্ধ, পড়ে রয়েছে জং ধরা কামান।

পুজোয় আমি বাইরেই কাটাই, এই maddening ক্রাউডএর mass hysteria থেকে দূরে একান্তে। মুস্কিল হয়েছে এবারে আমার সিনিয়র কলিগদের হঠাৎ বোধোদয় হয়েছে যে তাহারা সারা বৎসর প্রচুর কাজ করিয়াছেন, এবং পুজোয় বাড়িতে পদার্পণ না করিলে তাহদের ডিভোর্স অবশ্যম্ভাবী। তাই এই বাউন্ডুলে সংসার বর্জিত বালকটির ওপর দায়িত্ব বর্তালো যে, সপ্তমী ও নবমীর বলীর পাঁঠা হওয়ার। বলি যখন হতেই হবে, ভাবলাম ঈষত্ কচি পাতা খেয়ে নেওয়া যাক এই ফাঁকে। ঠিক করলাম মেদিনীপুরের প্রাচীন দুর্গা পুজো দেখে আসবো । (অবশ্যই ডিউটি করে!) তো আমার এই inquisitiveness টা তৎক্ষণাৎ স্থানান্তরিত করলাম হাতের মুঠোফোন এ। Gemini দুর্বোধ্য উচ্চারণে গড়গড় করে মুখস্ত বলে গেলো দ্রষ্টব্য স্থানগুলি। মুস্কিল হলো, জেমিনি ও ChatGPT দুজনেই ভূগোলে আমার মত গোল্লা।  এই ঘোর কলিতে, এই পাপীকে উদ্ধার করতে উদয় হলেন কল্কি অবতার,আমাদের ল্যাব এর মানস দা। দাদার দ্বিচক্রজানে নিজেকে সমর্পণ করে আমরা চক্রাকারে বেরোলাম শৈলপুত্রির অন্বেষণে। ( দেখলেন, দিদির মত না পারলেও, sushi থেকে শৈলপুত্রী ঠিক মিলিয়ে দিলুম।)

প্রথম গন্তব্য, বড়বাজারের মল্লিক বাড়ির দুর্গা পুজো। গিরগিটি বেল্লিকদের সাথে এদের কিছু একটা দূরসম্পর্কের আত্মীয়তা আছে বলে শুনলাম।
তারে জর্জরিত মল্লিক বাড়ি, দুই পুং সিংহের (ব্রিটিশ imperialism) মাঝে কালো নেটিভ (সাঁওতাল)। 

১৮৭৭ এ Dilli durbar এ রানী ভিক্টোরিয়ার হাত থেকে জন্মেজয়  মল্লিক কর্তৃক জমিদারীর সনদ নেওয়া থেকে ১৯১১ তে এই বংশের জামিনিনাথ মল্লিককে ব্রিটিশ কর্তৃক  গ্রেপ্তার , midnapur bomb conspiracy case এ-- এই বংশ ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।
৩৫০ বছর পুরোনো বনেদি বাড়ির পুজো, শুরু করেছিলেন জন্মেজয় মল্লিক, বর্গী ও ইংরেজ জল দস্যুদের হাত থেকে বাঁচতে শক্তির আরাধনা করে।( শিবাজীর বংশধরেরা মারাঠা বর্গী, যারা ১৭৩০-৪০ এ বাংলা আক্রমণ করেছিল; দুর্ভাগ্যবশত আমরা সেই শিবাজীর এখন পুজো করি!)
রাধাকান্ত জিউ এদের কূলদেবতা, টেরাকোটার মন্দির, এরা আদতে বৈষ্ণব।
মন্দিরে দরজা রুপোর,তাতে দশাবতার খচিত
মকর
ডাকের কাজে রত্ন শোভিতা হিরণ্যবর্ণা মহিষাসুরমর্দিনী 
রাবণ বধ, টেরাকোটা 
কৃষ্ণ লীলা
অন্দরমহল, এখন থেকে মেয়েরা যাত্রা ও পুতুল নাচ দেখতো । 

এই বাড়িতে ক্ষুদিরাম বসু, বারিন্দ্র কুমার ঘোষ আর সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকেছিলেন। অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের সাথে এদের রীতিমতো যোগাযোগ ছিল। এই বাড়িতেই বঙ্গ ভঙ্গের রূপকার governor general Lt Fraiser এর ট্রেন দুর্ঘটনার নাশকতার পরিকল্পনা করা হয় (১৯০৭)
আটচালা রাধাকান্ত ও নবরত্ন দুর্গা মন্দির 
বৈষ্ণব মতে দুর্গা পুজো হয় প্রতিপদ থেকে,  এখানে বলি হয় না। উল্টো রথের দিন থেকে ঠাকুর গড়ার কাজ শুরু হয়।সন্ধিপূজা তে কামান ধ্বনি এখন বন্ধ। 
দশমীতে ৩০ জন বেহারার কাঁধে চেপে মা পালকিতে  এখনও কঙ্কাবতী তে নিরঞ্জিত হন। আগে হাতি ঘোড়া সহযোগে বিশাল বর্নাঢ্য শোভাযাত্রা করে দেবী ফিরে যেতেন সপরিবারে কৈলাস। এখনও তার কিছুটা হলেও বজায় আছে।
মানস দা বললেন যে এখানে রাসযাত্রা খুব বড় করে হয়, বাইরের রাসমঞ্চ ও শিব মন্দির আমায় দেখালেন।

মল্লিক বাড়ি মেদিনীপুরের  reel ক্ষেত্র, দেখলাম প্রচুর কচিকাঁচা ফটোগ্রাফি ও reel বানাতে ব্যস্ত। জায়গাটাও খুবই সুন্দর, বসে বসে পুজো দেখলাম কিছুক্ষণ।

আমাদের পরের গন্তব্য ভীমচকের মুখার্জী বাড়ির অভয়া দুর্গা, তার আগে কর্নেলগোলার ঠাকুর দর্শন করলাম।
৯৩ বছর পুরোনো, অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রথম বারোয়ারী দুর্গা পুজো। উল্টদিকেই ব্রাহ্ম সমাজের ভাঙ্গা বাড়ি আজও বিদ্যমান।
কালের করল গ্রাসে ভগ্নপ্রায় রাম ব্যানার্জীর বাড়ির। ৩০০ বছর পূর্বে এই বংশের এক বিধবা, মায়ের পুজো আরম্ভ করেন অভয়া রূপে। সামনের পুকুর থেকে মা এর অলঙ্কার ও রুপোর বাসন কোসন পাওয়া যায়। পুজো প্রচণ্ড ভাবে ঘরোয়া, ঠাকুর দালানে আমি বাদে গুটিকয়েক বাড়ির লোক। দ্বিতীয়া থেকেই পুজো শুরু, হোমাগ্নিতে মুড়কি পোড়ানো হয় দশমী পর্যন্ত। জন্মাষ্টমীর দিনে রুপোর থালায় করে কঙ্কাবতী থেকে মাটি এনে শুরু হয় মূর্তি গড়ার কাজ।দশমীতে শোভাযাত্রা করে প্রতিমা নিরঞ্জন,সাথে রথ ও।
মা দ্বিভূজা, বরাভয় মূর্তি। অস্ত্রশস্ত্র ও অসুরবিহীন। মা এর ছেলে মেয়েদের হাতেও অস্ত্র নেই। এমনকি সিংহ ( সাদা) ও ময়ূর ছাড়া কোনো বাহন ও নেই। দুধারে জয়া ও বিজয়া।অহিংসা পুজো, তাই এখানে বলি বা নিরামিষ, দুটোই নিষিদ্ধ।
মানস দা বলল, সন্ধিপূজা তে মা এখানে রুপোর থালায় সিঁদুরের ওপর পা এর ছাপ ফেলে যান; এই পাপি চোখে সে দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হয় নি। যদি সরকার বাহাদুর পরের বছর এখানেই ফেলে রাখে,তো চেষ্টা করে দেখব।
দুর্গা দালানের পাশেই কুলো দেবতা, জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রা। সাথে শীতলা মা।
"An eye for an eye will only make the whole world blind" এই যুদ্ধবাজ পৃথিবীতে দিকে দিকে আরও অভয়া দুর্গার পুজো হোক।

আজকের শেষ ঠিকানা মির্জা বাজারের মুখার্জী বাড়ি।
( ইচ্ছে ছিল আর ও ঘোরার, কিন্তু আমি মডার্ন যুগের ক্রীতদাস, এর পর ল্যাব এ যেতে হবে!)২০০ বছর আগে, বিরাট রাজার রাজপুরোহিত রাখাল চক্রবর্তীর হাত ধরে এই পুজোর সূচনা । জমিদারি আমলে প্রতিমা তৈরির অনুমতি না থাকায় পটচিত্রেই দেবীর আরাধনার রীতি চালু করেছিলেন তিনি ।
শিব মন্দির
কুলো দেবতা রাধা কৃষ্ণ
৬ফুট বিশাল পটে মায়ের রূপ। হাতি ঘোড়া বাদ্যি যন্ত্রে একসময় ঘট উত্তোলন হত, এখন সব অস্তগামী।
দশমীতে মা কে বিদায় জানানো হয় পান্তা ভাত ও মাছ পোড়া দিয়ে ( শোল, ল্যাঠা; গ্রাম বাংলার মাঠের মাছ; রুই কাতলা ইলিশ নয়)। এদের বিশ্বাস, কৈলাশে শিব যদি জিজ্ঞেস করে, কি খেয়ে এসেছো, মা যেন বলে ,"বাপের বাড়ির লোকজন গরীব, ঘী পঞ্চ ব্যঞ্জন খাওয়াতে পারেনি, ওই পান্তা ভাত আর মাছ পোড়া খাইয়েছে!"

প্রাচীন বাংলার দারিদ্রতার মধ্যেও এই যে আন্তরিকতা, উমা যে রণ চণ্ডী থেকে বাড়ির মেয়ে অপর্ণা হয়ে গেছে, এ শুধু এই বাংলা দেশেই সম্ভব। থিম দেখনদারির ও সনাতন হিন্দু ধর্মের সাঁড়াশি আক্রমণে এই বৈচিত্র্য, এই শারদ উৎসব আজ বিলুপ্তির পথে। 

"আসছে বাবা দিগম্ববর 
বুড়ি তুই গাঁজার জোগাড় কর"

তথ্যস্বীকার:
১. পুজো পরিক্রমা ইটিভি ভারত
২. মানস দা, midnapur er encyclopedia 
ইচ্ছে ছিল, নবমী ও দশমীর ঠাকুর দেখার গল্পটাও এখানেই বলব, কিন্তু বিধি বাম। সেই বামের গল্প আরেকদিন হবে। (প্রথম দূর্গা সেনাপতি গ্রামের মা বিশালাখী,সে গল্প কালকে বলব!) কিছু পুজো বাকি থেকে গেলো।
স্বর্ণালংকার এ শোভিতা গজলক্ষ্মী (যমুনা জুয়েলার্স , মিরজাবাজার)

Comments

Popular posts from this blog

Bai tu long bay.....the land of the dragons

নাগা দের নকশী কাঁথা

Bromo র চিঠি